এ হাসান : | বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
স্বীকার করতেই হবে ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে একটি বিষয়ে বিজেপি তৃণমূলের থেকে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। আর তাহল বিজ্ঞাপন।
বিজ্ঞাপন মানে? বলতে হবে বিজ্ঞাপনের সয়লাব। অর্থাৎ কি না বিজ্ঞাপনের সুনামি! ওয়েব দুনিয়ায়, ইন্টারনেটে পশ্চিমবঙ্গের ‘বিকাশ’ হবে এই প্রোপাগন্ডা, আর সঙ্গে মোদিজির বিশাল ছবি ছাড়া অন্য কিছু নেই। আপনি যে ওয়েবসাইট বা নিউজ পোর্টাল চেঞ্জ করে বিজেপির এই সব বিজ্ঞাপন এড়িয়ে যাবেন, তার কোনও ছাড় কিন্তু বিজেপির আইটি সেল রাখেনি। আপনি নিউ ইয়র্ক টাইমস খুলুন কিংবা আনন্দবাজার কিংবা মোদিজির ‘ফাদারল্যান্ড’ ইসরাইলের কোনও ইংরেজি পত্রিকা সব জায়গায় ছেয়ে আছে বিজেপির একের পর এক বিজ্ঞাপন। এমনকি ঘুষপেটিয়াদের দেশ বাংলাদেশের পত্রিকাগুলির ওয়েবসাইট তা সে ‘প্রথম আলো’ই হোক কিংবা ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ দেখবেন বিজেপির আইটি সেল গুগলের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে কিংবা অন্য কোনোভাবে নিজেদের বিজ্ঞাপনে ভরিয়ে দিয়েছে। কবির কথায়, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’র মতো অবস্থা। আর কলকাতা ও জেলা শহরের বড় বড় হোডিংয়ের বেশির ভাগ জায়গাই বিজেপি আগে থেকে কিনে রেখেছে।
সেদিক থেকে বলতেই হবে তৃণমূল মোকাবিলা করে উঠতে পারেনি। কিংবা তৃণমূল হয়তো ভেবেছে, মানুষ শুধু বিজ্ঞাপন দেখে না, দেখে বাস্তবতাও।
তা বিজেপির বিজ্ঞাপনগুলিতে কি রয়েছে? যেমন উত্তরবঙ্গে এইমস, আইআইটি, আইআইএম স্থাপিত হবে। পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার। অন্য বিজ্ঞাপন হল, মহিলারা হবেন স্বনির্ভর, ৭৫ লাখ মহিলা লাখপতি দিদি। আর একটি বিজ্ঞাপন হল, যুবদের প্রতি মাসে ৩০০০ টাকার আর্থিক সহায়তা। এছাড়াও রয়েছে ৫ বছরে যুবকদের জন্য ১ কোটি কর্মসংস্থান। সরকার গড়লেই ইউসিসি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড) বাস্তবায়িত হবে।
মুশকিল হল, বিজেপির সব কথাই হচ্ছে ‘হবে’। কোথাও নেই বিজেপি শাসিত ডবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলিতে এখনও পর্যন্ত কি হয়েছে। দিল্লিতে বিজেপির নয়া মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা সাক্ষী আছেন, বিজেপি ওয়াদা করেছিল, কেজিওয়ালের আপ সরকারকে নির্বাচনে হটাতে পারলেই প্রত্যেক মহিলার খাতায় ঢুকবে ২৫০০ করে টাকা। খাতায় মানে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। কিন্তু হায়, দিল্লি নির্বাচনের প্রায় ১৪ মাস হয়ে গেল, একটি টাকাও কিন্তু মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ঢোকেনি। দিল্লির মহিলারা অবশ্য বিশ্বাস করে প্রতিদিনই অ্যাকাউন্ট চেক করেন! হয়তো মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার ৫ বছরের মেয়াদেই পুরোটাই তারা প্রতিদিন নিয়ম করে অ্যাকাউন্ট চেক করতে থাকবেন! বাংলাতে প্রবাদ আছে ‘আশায় বেঁচে থাকে চাষা’!
তবে একটা কথা বলা যায়, মোদিজির ওয়াদা মতো কোনও ভারতবাসীর অ্যাকাউন্টেই সেই প্রবাদপ্রতীম ১৫ লক্ষ টাকা আজও ঢোকেনি। পেরিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর। অবশ্য মোদিজির সুযোগ্য সহযোগী অমিত শাহজি সব দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলেছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আরে ও তো মোদিজি কা এক জুমলা থা’।
এই ধরনের অসংখ্য নজিরের কথা বলা যায়। উত্তরবঙ্গে নাকি এইমস, আইআইটি, আইআইএম হবে। এই ‘নির্বাচনী জুমলা’ উত্তরবঙ্গবাসীরা কি খাবে? কারণ, কোথায় হবে, কখন হবে, এসব কিছু তো বলা হচ্ছে না। তাই ‘জুমলা বিজ্ঞাপনে’ অনেকেরই পেত্যয় হচ্ছে না। অসংখ্য ‘হবে’ বিজ্ঞাপনের ভিড়ে সেই হিন্দি সিনেমার গানটির কথা মনে পড়ে যায়, ‘ওয়াদা তেরি ওয়াদা…’।
বাংলার মহিলারা কিন্তু বলছেন, ভাই, তোমার ওয়াদায় বিশ্বাস করলে দিদি আমাদের যে লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কন্যাশ্রী, সবুজসাথী, যুবসাথী, সড়ক ও গ্রামোন্নয়ন সব কিছুই কিন্তু ভ্যানিশ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। দিদির হাত আমরা ছাড়ছি না।
বিজেপি খুব ভালো করত যদি প্র্যাক্টিকেলি একটি সাফল্যনামা বাংলায় পেশ করত। যেমন, তারা মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মণিপুর প্রভৃতি রাজ্যগুলিতে যেখানে তাদের ডবল ইঞ্জিন সরকার রয়েছে, সেখানে মহিলা, আদিবাসী, দুর্বল শ্রেণির জন্য কি করেছে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সড়কেও বা তাদের উন্নয়ন এবং জনগণের হাতে তা পৌঁছানোর খতিয়ানটা তুলে দিলেই তো বাংলার মানুষ খাবি খেয়ে মোদিজিকে ভোট দিত। আর তাহলে বিজেপির কয়েক হাজারা কোটি টাকার বিজ্ঞাপনের খরচ তো বেঁচে যেত! এছাড়া একটা বিজ্ঞাপন কিন্তু গেরুয়া সমর্থকরা খুব খেয়েছে! তাহল, বিজেপি বাংলায় জিতলে ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) চালু হবে। এই আশায় তো গেরুয়াপন্থীরা এতদিন বেঁচে ছিলেন। ইউসিসি এলে তাদের কত স্বপ্নই না পূরণ হবে! হিন্দু জয়েন্ট ফ্যামিলি আইনে যে সুবিধা লাখ লাখ হিন্দু পেয়ে থাকেন, তা উবে যাবে। আর মুসলিমরা নতুন করে ঘুষপেটিয়া হয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামে পালিয়ে যাবে!
বিজেপির বিজ্ঞাপনগুলির প্রতিটির নিচেই লেখা থাকে, ‘ভয় আউট ভরসাই ইন’। তবে মনে হয় বাংলার মানুষ বলছে ‘জয় আউট দিদির প্রতি ভরসাই ইন’।
Posted ১০:৪১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh